Recent Post

স্মৃতি-বিস্মৃতি: প্রিয়াংকা রায়

স্মৃতি-বিস্মৃতি: প্রিয়াংকা রায়

মিহিরের আজকাল প্রায় কিছুই মনে থাকে না। স্ত্রী চলে যাবার পর থেকেই এই ভুলে যাওয়া বাতিক। বিশেষ করে, তার কারও চেহারা মনে পড়ে না। ছবির মতো ঘর, রাস্তা, বাজার, চায়ের দোকান, পার্কের বেঞ্চিটা কেমন দেখতে, কিছুই আর তেমন মনে নেই। 

সল্টলেকের এই বাড়িটা কবে বানিয়েছেন বেশ মনে আছে, কিন্তু বাড়ির ঘরগুলো, ছাদ, বারান্দা কিছুই মনে পড়ে না।

তবে, অনেকে মিলে হইহই করে থাকত সবাই। স্ত্রী সুভদ্রা, দুই ছেলে মলয়, সুজয় আর ছোট মেয়ে সুমনা। পাঁচ জনের ভরা সংসার ছিল। এখন সে একাই থাকে।

তার কিন্তু সব্বাইকে মনে আছে, শুধু মনে নেই ওদের দেখতে কেমন। এমনকি, দেয়ালের ছবিটা না দেখলে স্ত্রী সুভদ্রার মুখটাও মনে থাকেনা। চেহারা মনে করতে গেলেই সব ঝাপসা হয়ে যায়। মানুষগুলো সবাই আছে কিন্তু মুখের অবয়বটা পুরো কালো। ভয় লাগে ভাবলেই। ভয় লাগে বলেই আর ভাবে না, নিজের মতো বই প’ড়ে, গান শুনে সময় কেটে যায়।

অনেকদিন পরে আজ সুমনা এসেছে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে। ঘুম থেকে উঠেই সে চমকে গিয়েছিল সামনেই একটা অচেনা বাচ্চা ছেলেকে দেখে। ঘরময় ছুটে বেড়াচ্ছে আর জিনিসপত্র এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে তাণ্ডব করছে।

কে বাচ্চাটা? কোথা থেকে এলো? তার শোবার ঘরেই বা কী করছে? এইসব ভেবে ভেবে যখন তার মাথাটা গুলিয়ে যাচ্ছিল ঠিক তক্ষুনি হঠাৎ বাচ্চাটা তাকে দেখে  “দাদু দাদু” বলে ডাকতে শুরু করল। চমকে উঠেছিল সে। বাপরে, কাণ্ড একখানা! বুকে হাত দিয়ে অনেক্ষণ বসেছিল। বাচ্চাটা যখন বলল, “দাদু, ও দাদু, আমি তুতান, চিনতে পারছ? জানো দাদু, আজকে তোমার হ্যাপি বার্থডে তাই আমি আর মাম্মাম একটা কেক নিয়ে এসেছি। চলো, তুমি কেক কাটবে আর আমি খাব, দারুণ মজা হবে।”

একটু ধাতস্থ হয়ে সে মনে করল, তাইতো, তুতান তার একমাত্র নাতির নাম। সে বুঝল, নাতি এসেছে। তার কি অবস্থা! আদরের নাতির মুখটাই মনে পড়ল না? কী যে দুঃখ পেলেন মনে মনে, ইস!

সুমনাকে দেখেও সে চিনতে পারেনি। আন্দাজ করে নিয়েছে। গলার স্বরটা চেনা চেনা মনে হয়েছে। তাই তেমন অসুবিধে হয়নি। সে এই না চিনতে পারার সমস্যাটার জন্য কারো মুখের দিকে আজকাল তাকায় না। বিকেলে সুমন্ত যখন মা-ছেলেকে নিতে এল, তখন তাকে প্রণাম করেছিল। মিহির কিন্তু একবিন্দুও তাকে চিনতে পারেনি। অদ্ভুত দৃষ্টিতে যখন সে অচেনা মুখের দিকে একবার তাকিয়েছিল, তখন তার বড্ড ভয় হয়েছিল। তক্ষুনি তক্ষুনি সে চোখের দৃষ্টি নামিয়ে নিয়েছিল।

তার বাড়ির কাজের মেয়েটার নাম কণিকা। সুভদ্রা যখন অসুস্থ হয়েছিল, সে তখন থেকেই আছে। বাড়ির সব কাজের দায়িত্ব এখন কণিকার। ভোর সাতটায় সে আসে, বাড়ির কাজকর্ম করে দুপুরে মিহিরের খাবার খাওয়া হলে সব গুছিয়ে রাখে। মিহিরের বিকেলের চা খাওয়া হয়ে গেলে রাতের খাবার টা টেবিলে গুছিয়ে রেখে সন্ধ্যের দিকে সে চলে যায়। বাড়ির এক সেট চাবিও থাকে কণিকার কাছে। আজকাল সকাল সকাল ঘুম ভাঙে না মিহিরের। তাই এই ব্যবস্থা।

কণিকা অবশ্য খুব একটা সামনে আসে না। সকালের টিফিন দিয়ে যাবার পরে সে যখন ঘর মোছে তখনই একবার যা দেখা হয়। ব্যস, ওইটুকুই। রোজ দেখে বলেই হয়তো কনিকাকে না-চেনার সমস্যাটা একটু কম। তা ছাড়া, মেয়েটা কথা বলে যায় অনর্গল। রাস্তায় কী সমস্যা, বাসে কী ভিড়, জিনিসপত্রের দাম সব আগুন, ছেলে মেয়েরা আজকাল গোল্লায় যাচ্ছে, শ্বশুর বাড়িতে তার মেয়েটার কত কষ্ট, বরটা রোজ রাতে মদ খেয়ে এসে মারধোর করে, এইসব নানান কথা। বলেই যায়, বলেই যায়। মিহির এসব কথা শুনেও শোনে না। অনর্গল কথাগুলো তার বড্ড একঘেয়ে লাগে। একটানা বেজে যাওয়া বাঁশির মতো শোনায়। বেসুরো বাঁশি।

এক সপ্তাহ প্রায় কেটে গেছে তুতান সুমনারা এসেছিল। আজকাল আর কারও সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে করে না তার। আজকাল দুপুরে সে নিজের মতো খেয়ে উঠে পড়ে। বারান্দায় বসে বই পড়ে, গান শোনে। ঘর থেকেও বের হয়না বহুদিন। বাইরে বেরোতে তার ভয় লাগে। কারণ, কিছুতেই সে রাস্তা-ঘাট, গলি-পথ, হারুর চায়ের দোকান, মিনতির চপের ঝুপড়ি মনে রাখতে পারে না। শুধুই হারিয়ে যায়। পৃথিবীর  সব্বাই তার অচেনা। তার উপর চেনা মানুষের মুখ মনে করতে চেষ্টা করলে সবটাই মনে আসে শুধু মুখটা ছাড়া। মুখটা পুরো কালো। বড্ড ভয়ঙ্কর সেই রূপ আর বড্ড অচেনা। এই অচেনাকে তার বড্ড ভয় করে।

ক-দিন ধরে বারান্দাতে বসতেও তার ভালো লাগছে না।

এই সেদিনই এক মধ্যবয়স্ক লোক তাকে ডেকে বলল, “মিহিরদা, কেমন আছো? শরীর ভালো তো?” 

সে চিনতেই পারলো না লোকটাকে। লোকটা অবশ্য হেসে বলেছিল, “কী গো? চিনতে পারছ না বুঝি? আচ্ছা আচ্ছা বুঝেছি। আমি অলোক, তোমার পাশের ফ্ল্যাটে থাকি। এবার মনে পড়েছে?”

মিহির শুনে কৃত্রিমভাবে একটু হেসেছিল। কিন্তু পরক্ষণেই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। অলোকের নামটা তার চেনা, চেহারাটা ভাবতে গিয়েই ঘটেছে গণ্ডগোল। হঠাৎ লোকটার মুখটা কালো হয়ে গেল। একটা মুখশ্রীহীন মানুষ কথা বলছে তার সঙ্গে মনে হল তার। ভয় পেয়ে সে ঘরে চলে এসেছিল। তাছাড়া, এই ভেবেই তার ভয় হচ্ছে যে, আজকাল যে যা বলছে তাকে তাই মেনে নিয়ে হচ্ছে, কারণ তার অনেক কিছুই মনে নেই।

 ঠিক মনে নেই বললে ভুল হবে। এই যে অলোক, যার মুখটা তার মনে পড়ছে না, সে তাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকে। গতবছর তার ছোট মেয়ের বিয়ে হয়েছে। এখন থাকে সিঙ্গাপুরে। বড় মেয়ে থাকে কল্যাণীতে। অলোক ডিভিসিতে চাকরি করত।  রিটায়ার্ড পার্সন। এখন অবশ্য একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত আছে। এতো কিছু মনে আছে শুধু মুখটাই মনে নেই। কী যে সমস্যা! কিছুতেই কারও চেহারা মনে করতে পারছে না সে। দিন দিন সমস্যাটা বেড়েই চলেছে।

আজ মিহিরের সকাল থেকেই মাথাটা ব্যথা করছে। তার ওপর, কণিকা আজ সারা বাড়ির পর্দা ধুয়ে দিয়েছে। সারা বাড়ি বড্ড বেশি আলোয় ভরে গেছে। এত আলো তার ভালো লাগছে না। ঘুমটাও ভেঙে গেছে ভোর ভোর। তাকে এত ভোরে উঠতে দেখে কণিকা অবাক হয়ে কী যেন বলতে এসেছিল, কিন্তু মিহির তাকে চিনতে না পেরে চমকে উঠেছে। অচেনা এক মহিলা কী করছে তার বাড়িতে?

চমকে উঠে সে প্রশ্ন করেছিল, “কে তুমি? কী করছ এখানে?”

তার প্রশ্ন শুনে সেই মহিলা আঁতকে উঠে বলল, “এ কি বলছ দাদাবাবু? তুমি কি আমাকেও চিনতে পারছ না? সে কী? দিদিমণিকে তো বলতে হচ্ছে এই কথা।”

আর শোনেনি কিছু সে, মাথাটা ঝিমঝিম করছে তার।

অনর্গল কথার ঝড় উঠল যখন, তখন মিহির বুঝেছে, এ কণিকা ছাড়া আর কেউ হতেই পারে না। কিন্তু তার মুখটা মনে পড়ছেনা। 

অভ্যাসবশত সে দাঁত ব্রাশ করে ব্রেকফাস্ট করে নিল। তার হঠাৎ ঘরটাকে বড্ড অচেনা লাগছে আজ। সব উলটোপালটা হয়ে যাচ্ছে। কিছুতেই সে নিজের পদবী মনে করতে পারছে না। নিজেকে পাগল পাগল লাগছে। টেবিলের ওপর রাখা খবরের কাগজের ওপর একটা খাম রাখা আছে। ইলেক্ট্রিসিটি বিলের কাগজ। খামের ওপর মিহির দাস নামটা দেখে অবশেষে তার নিজের পদবীটা মনে পড়ল।

আজ তার স্নানের সময় মনে হচ্ছিল দরজাটা রং টা যেন কালো হয়ে গেছে। ড্রেসিং টেবিলের সামনের আয়নায় পর্দাটা নেই। তাই  চুল আঁচড়াতে গিয়ে হঠাৎ আয়নায় চোখ পড়ল। চমকে উঠলেন তিনি। আয়নায় এ কাকে দেখছেন তিনি? এই মানুষটা কে? বৃদ্ধ, পাকা চুল আর কোঁচকানো চামড়ার গাল। লোকটা কে? লোকটা অবিকল তাকে মিমিক্রি করছে।  

 তবে কি সে এই রকম হয়ে গেছে? তাকে কি এই রকমই দেখতে? কী জানি? 

তাকে যেন কেমন দেখতে, ভাবতে গিয়ে হঠাৎ সে দেখল আয়নায় সামনের লোকটার মুখটা নেই, সেই জায়গায় একটা চোখ, নাক,মুখবিহীন একটা কালো মুখশ্রী। সে হাত দিয়ে নিজের চেহারা স্পর্শ করতে গেল। ক্রমশ যেন তার হাত ওই কালো  মুখশ্রীর মধ্যে ঢুকে যেতে লাগল। আতঙ্কে তার শ্বাসকষ্ট হতে লাগল। 

ভয়ে তিনি চোখ বন্ধ করে ফেললেন। চোখ আড়চোখে খুলে আবার দেখলেন। সামনের মানুষটিকে তিনি বিন্দুমাত্র চেনেন না। এ কোথায় আছেন তিনি? চারিদিকের সব কিছু অচেনা। সামনের মানুষটাও অচেনা।  তার খুব ভয় করছে। মাথাটা ঘুরে গেল তার। চোখের সামনেটা হঠাৎ ঝাপসা হয়ে এল।

অজ্ঞান হয়ে যেতে যেতে তিনি দেখতে পেলেন, কণিকা ছুটে আসছে তার দিকে, কিন্তু তার মুখটা নেই। সেখানে একটা জমাট অন্ধকার।

Author

  • প্রিয়াংকা রায়

    যাঁর কবিতায় ফুটে ওঠে নানান ছবি, শব্দেরা কথা কয়; তিনি হলেন কবি প্রিয়াংকা রায়। জন্ম ১৯৮৪ সালে কলকাতা শহরে। তাঁর বাল্যকালের অনেকটা সময় কেটেছে শান্তিনিকেতনে আর কিছুটা সময় কলকাতায়। বিদ্যালয় জীবন অতিবাহিত করেন বিশ্বভারতীর পাঠভবনে আবাসিক ছাত্রী হিসাবে, এরপর উচ্চতর শিক্ষার জন্য বেশ কিছু খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সৌভাগ্য হয় তাঁর। এগুলির মধ্যে ডব্লুবিইউটি, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় উল্লেখযোগ্য। তিনি একাধারে এম টেক পাঠ সম্পূর্ণ করেন এবং পরবর্তীতে রবীন্দ্রসংগীত বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও অর্জন করেন। কবি শ্রীমতী রায় বর্তমানে বোলপুরের বাসিন্দা এবং শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত আছেন। এরই সঙ্গে তিনি ভালোবাসেন সংগীত চর্চা, হাতেরকাজ, সেলাই, খেলাধুলা প্রভৃতি। তাঁর কথায়, "লিখতে গেলেই মনে হয় বিশালত্বের পাশে ক্ষুদ্রের চিত্রলিপি।" ছেলেবেলায় পাঠভবনের শিক্ষা ও পরিবেশ তাঁর আত্মকথনের সাহস। পাঠভবনের সাহিত্যসভা ও নানা অনুষ্ঠানের হাত ধরে একটু একটু করে লিখতে শেখা, মনের ভাব পেন্সিলের আঁকিবুকিতে খাতায় ফুটিয়ে তোলার মধ্যে দিয়ে যে অভ্যাসের সূচনা হয়েছিল আজও সেই সাধনা তাঁর অব্যাহত রয়েছে। সেই ছবিই ফুটে উঠেছে নবতরু ই-পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর বিভিন্ন কবিতায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Nabataru-e-Patrika-2023-9.jpg
ছোটো গল্প

কলার বাকল: রানা জামান

    জাবের ও নাভেদ বের হয়েছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ভ্রমণে। ওরা চলে গেল নেত্রকোণা জেলার দুর্গাপুর উপজেলায়। সাদা সিমেণ্ট দেখবে। বাংলাদেশের আরেক মূল্যবান খনিজ; চিনামাটির তৈজসপত্র তৈরি করা হয়। পাহাড়ি এলাকায় ঘুরাঘুরি করতে ওদের বেশ লাগছে। ছোট ছোট পাহাড়ে উঠে ছবি তুলছে দেদার, সেল্ফিও নিচ্ছে। সকাল এগারোটা বাজছে। খিদে খিদে ভাব অনুভব করছে পেটে। চা পানের […]

    বিশদে পড়তে এখানে ক্লিক করুন
    ছোটো গল্প

    বোকার চালাকি: সৌমেন দেবনাথ

      দেখতে যেমন বোকা বোকা, কথাবার্তায়ও তেমন বোকা বোকা। কাজে-কর্মের ধরণ-ধারণেও বোকামি বোকামি ভাব। চলন-বলনেও বোকা বোকা দেখতে লাগা মানুষটার নাম আক্কাস। সহজ-সরল আর আলাভোলা এই লোকটাকে নিয়ে আমরা যথেষ্ট  মজা-মশকরা করি। যখন মন চায় তখনই তাকে ডেকে নিয়ে যেদিক সেদিক চলে যাই।

      বিশদে পড়তে এখানে ক্লিক করুন
      ছোটো গল্প

      মানসী: তুলি মুখোপাধ্যায় চক্রবর্তী

        হঁ বাবু, যে শরীর তুকে শান্তির ঘুম দেয়, একটা ছবি থাকবেনি তার! কুতোওও ছবি তুর আঁকা, বিকোয় দেশ বিদেশ, একটা লয় ইখানেই থাইকবে, মাটির ঘরে

        বিশদে পড়তে এখানে ক্লিক করুন