শান্তিনিকেতনের দিনলিপি: শ্রীবাস বিষ্ণু
শান্তিনিকেতন আশ্রম তার আপনজনের পথ চেয়ে দিন গুনছে। কবে তারা আসবে। ছাত্রছাত্রীশূন্য আশ্রম দেখে সকলেরই মন ভার। ছাত্রাবাস ছাত্রীনিবাসগুলি বন্ধ। ‘করোনা’ সব কিছু এলোমেলো করে দিয়েছে। খোলা থাকলে বিদ্যালয় চত্বর শিশুদের ছুটোছুটি কলকাকলিতে মুখর থাকত। তার সঙ্গে মৃদুমন্দ হাওয়ায় আশ্রমের গাছগুলির মধ্যেও খুশির নাচন লক্ষ্য করা যেত। পাখির ডাক, কাঠবেড়ালির ত্রস্ত দৌড় সব মিলিয়ে সমগ্র বিদ্যালয়ের পরিবেশ ছাত্রছাত্রী থেকে সকলের কাছে এক আনন্দনিকেতন। বিগত বছর মার্চ মাসে ‘বসন্ত-উৎসব’ করোনার প্রাদুর্ভাবে অনুষ্ঠিত হয়নি। তারপর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে। এখন প্রত্যক্ষভাবে বিশ্বভারতীর ক্লাস বন্ধ, তবে অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে। শালবীথি, আম্রকুঞ্জ, বকুলবীথি সমগ্র চত্বর জুড়ে এক প্রাণহীন নীরবতা। প্রাক্তন, আশ্রমিক থেকে বহিরাগত, আশ্রম চত্বরে কারও প্রবেশের অনুমতি নেই। প্রবেশপথের চারিদিকের প্রহরীদের নজরদারি। প্রাক্তনীদের মন বিষণ্ণ তাঁদের প্রশ্ন, “কেমন আছ আশ্রম?”
এ সবের মধ্যে পূর্বে কিছু কিছু অনুষ্ঠান নির্দিষ্ট সংখ্যক দর্শক নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে কিন্তু বর্তমানে ‘করোনা’র দ্বিতীয় ঢেউ যেভাবে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে তাতে মে মাসের গোড়া থেকে সমস্ত কিছুই বন্ধ। এ-বছর প্রথম গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন উপলক্ষ্যে পঁচিশে বৈশাখে কবিগৃহ উত্তরায়ণ থেকে প্রত্যুষে কবিকন্ঠ এবং মন্দিরে সকালের উপাসনা হয়নি। সন্ধ্যায় আশ্রম চত্বর ছিল নীরব। পূর্বে রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় তাঁর সম্মতি নিয়ে জন্মদিনের অনুষ্ঠানটি হত নববর্ষের দিন। কারণ সে সময় প্রচন্ড গ্রীষ্ম ও জলাভাবের কারণে ২৫শে বৈশাখের পূর্বেই বিশ্বভারতী গরমের ছুটিতে বন্ধ হয়ে যেত। এখন ২৫শে বৈশাখের পর বিদ্যালয়ের গ্রীষ্মাবকাশ। কলেজের ছুটি হয় তার কিছু পরে। সে কারণে এখন শান্তিনিকেতনে নববর্ষের দিন রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনের অনুষ্ঠানটি না-হয়ে অনুষ্ঠিত হয় ২৫শে বৈশাখ। এ-বছর বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ। ১৯১৮ সালে ৮ই পৌষ রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের ছয়মাস পর জুলাই মাসে শুরু হয় ভর্তি ও পঠনপাঠনের ব্যবস্থা। আক্ষরিক অর্থে বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠা ১৯২১ সালের ৭ই পৌষ।

বিগত ১৫ মে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন উপলক্ষ্যে এক অনাড়ম্বর পরিবেশে বিশ্বভারতীর উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তী ছাতিমতলায় মহর্ষির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। যদিও মহর্ষির জন্ম দিনের অনুষ্ঠান ইতিপূর্বে শান্তিনিকেতনে অনুষ্ঠিত হয়েছে কি না জানা নেই। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ঠাকুরের জন্ম ১৫ মে ১৮১৭ এবং মৃত্যু ১৯ জানুয়ারী ১৯০৫ সালে। শান্তিনিকেতনের ইতিহাসে দেখা যায় ২০ জানুয়ারী মহর্ষিস্মরণ অনুষ্ঠানটি বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে পালন করা হয়ে থাকে। ওই দিন সকালে উপাসনা ও বিকেলে ছাতিমতলায় মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয়।
এ-বছর ২৯ এপ্রিল রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘন্ট অনুযায়ী বীরভূমে ভোটের দিন ছিল। বিশ্বভারতীর বহু কর্মী, অধ্যাপক এই নির্বাচনে প্রিসাইডিং অফিসার থেকে অবজারভারের গুরু দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্বভারতীর প্রবীণ কর্মী নবীন পন্ডিত ইলেকশন ডিউটি থেকে ফিরে করোনায় আক্রান্ত হলে কিছুদিন চিকিৎসার পর মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে শান্তিনিকেতনে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। করোনার থাবায় কয়েকজন প্রবীণ অধ্যাপক কর্মী থেকে আশ্রমিকের জীবনাবসান হয়েছে। আবার কয়েকজন কোভিড-১৯ জয় করে শান্তিনিকেতন ফিরেছেন।
এখন(মে মাস) বিশ্বভারতীর স্কুল কলেজে গ্রীষ্মাবকাশ চলছে, বিশ্বভারতী জুলাইয়ের প্রথম দিন খুলবে। ছাত্রছাত্রীরা কবে ফিরবে সে বিষয়ে নিশ্চিতরূপে কিছু বলা যাচ্ছে না। করোনা ভীতি কেটে গিয়ে কবে আশ্রম আবার আগের মতো ছন্দে ফিরবে, শোনা যাবে ক্লাসের ঘন্টা ঢং-ঢং-ঢং; এখন সবাই অধীর আগ্রহে তার প্রতীক্ষায় দিন গুনছে। ।
(শান্তিনিকেতন; ১মে, ২০২১)