Recent Post

উপহার: বরুণ মুখোপাধ্যায়

উপহার: বরুণ মুখোপাধ্যায়

রাস্তার পাশে ভিড়টা দেখে বাইকের স্পিড কমিয়ে থামতে চেয়েছিল সুমিত কিন্তু পিছনে বসা রিমলির বিরক্তিতে ভিড় এড়িয়ে সামনে এগিয়ে যেতে একপ্রকার বাধ্য হল সে। এমনিতেই বাড়ি থেকে বেরোতে বড্ড দেরি করে ফেলেছে ওরা। তার উপরে যদি এখন রাস্তায় এইভাবে দাঁড়াতে দাঁড়াতে যায় তাহলে তো রিমলির বাবার বাড়িতে পৌঁছতে খুব দেরি হয়ে যাবে। আর আজ দেরি হয়ে গেলে ভাই আবার ভীষণ বকাবকি করবে দিদিকে। সকাল থেকে বার দুয়েক ফোন করা হয়ে গেছে এরই মধ্যে। রণিত বারেবারেই বলেছে, সকাল সকাল আসতে না পারলে অনেক জমিয়ে রাখা কথা বলে শেষ করা যাবেনা। একমাত্র ভাই বলে কথা! তাছাড়া এবারের জন্মদিনটা নাকি রণিতের কাছে খুব স্পেশাল…এইসব কথা ভাবতে ভাবতে বাইকের পিছনে বসে বাবার বাড়ি যাচ্ছিল রিমলি। মাঝেমাঝেই বরকে তাড়া দিচ্ছিল, ” কী গো তুমি? আজও এইভাবে চালালে পৌঁছাব কখন?”

সুমিত বরবরই শান্ত স্বভাবের মানুষ। আর চালক হিসাবে তো আরও। বউ-এর কথায় বলে, ” তোমার কথা শুনে সেই একবার জোরে চালাতে গিয়ে কী হয়েছিল এরই মধ্যে ভুলে গেলে রিমলি?”

রিমলি বলে, “খুব মনে আছে, কিন্তু সেটা তো ছিল বিয়ের পর পর তোমার নতুন বাইক চালাতে অভ্যস্ত না হওয়ার জন্য।”

সুমিত আরও শান্ত হয়ে বলে, ” বাইকটা পুরোনো হলেও জীবনটা তো সেই দামিই আছে না কি?”

রিমলি সুমিতর পিঠে আলতো করে একটা চড় মেরে বলে, “খুব হয়েছে, এবার তো একটু জোরে চালাও।”

হঠাৎ এই জমে থাকা ভিড়টাকে দেখে খুবই বিরক্ত হল রিমলি। বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে না হলেও এখনও কম করে আধ ঘন্টার রাস্তা বাকি। এতক্ষণে নিশ্চয় রণিত খুব অস্থির হয়ে উঠেছে, গাড়িতে বসে বসেই এই কথা ভাবছিল রিমলি। ভাইয়ের জন্য এবার একটা লেটেস্ট মডেলের ব্লু-টুথ হেডফোন নিয়ে এসেছে ওরা। “ভাইটা যা গান পাগল, এটা পেয়ে খুব খুশি হবে নিশ্চয়!” মনে মনেই ভাবে রিমলি। তাছাড়া আর কয়েকদিন পরেই তো রণিত নতুন কাজের জায়গায় চলে যাবে। আবার হয়ত আসবে কয়েক মাস পর। তাই এবারের জন্মদিনের অনুষ্ঠান সত্যিই আলাদা রকম।

শীতের সকালটায় আজ বেশ কুয়াশা ছিল। এখনও ভালোভাবে রোদ ওঠেনি। তার সঙ্গে কনকনে ঠান্ডায় শীত বেশ জাঁকিয়ে বসেছে এখানে। পিছন দিক থেকে একটা অ্যাম্বুলেন্স জোর হুটার বাজিয়ে হুস করে পাশ কাটিয়ে চলে গেল, সঙ্গে পুলিশের একটা সাদা গাড়িও। ইউ-টার্ন নেওয়ার আগেই আবার বিপত্তি। পুলিশ চেকিং চলছে। এই এক সমস্যা, ভোটের আগে সবাই যেন একটু নড়েচড়ে বসে। বাইক, গাড়ি মিলিয়ে সামনে পাঁচ-সাতটা তো বটেই। তার মানে কমপক্ষে আরও দশ মিনিট দেরি। সুমিত গাড়িটা রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে একটা সিগারেট ধরালো। ওরা কাছাকাছি চলে এসেছে খবরটা একবার রণিতকে জানিয়ে দিতে বলল সুমিত। ফোনের রিং দু-চারবার বেজে গিয়ে কেটে গেল। সামনের বাইকে বসে থাকা দু-জন ছেলে কী একটা অ্যাক্সিডেন্টের কথা বলছিল, কানে এল। বোঝা গেল যে ভিড়টা তারা পেরিয়ে এসেছে সেখানেই একটা বড়সড় দূর্ঘটনা ঘটেছে আজ কিছুক্ষণ আগে। কৌতহলবশত সুমিত তাদেরকে জিজ্ঞাসা করল, “তেমন কোনও ক্ষতি হয়নি তো?”

উপহার: বরুণ মুখোপাধ্যায়

একজন উত্তর দিল, ” আপনিও ওই দিকেই এলেন, কিছু দেখেননি?”

-“কই না তো?”

-“সে কি এত বড় একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে কিছুই বুঝতে পারেননি?”

-“না, মানে..একটু অন্যমনস্ক ছিলাম কিনা…তাই হয়ত চোখে পড়েনি।”

দ্বিতীয় জন বলল, “যে চালাচ্ছিল তার অবস্থা সিরিয়াস, আর পিছনের বন্ধুটা শেষ! বাজারের সব বলাবলি করছিল ওদেরকে তারা চেনে। ওরা নাকি কোনও একটা দোকানে কেক কিনতে এসেছিল। ফেরার পথে পিছন থেকে নাকি একটা বালি বোঝাই ট্রাক ধাক্কা মেরে পালিয়েছে। বাইকটা দুমড়ে মুচড়ে অনেক দূরে পড়েছে।”

কথা বলতে বলতেই পুলিশ অফিসার বাইকের ছবি আর সাইড-বক্সের ভিতরটা একবার খুলে দেখানোর জন্য অনুরোধ করলেন। এটা নাকি তাঁদের রুটিন ডিউটি। হঠাৎ করে একটা মোটর-ভ্যান গতি কমিয়ে এসে দাঁড়াল তাদের পাশে। তাতে চাপানো একটা ভাঙাচোরা বাইক। পুলিশ রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিল। রিমলি সুমিতের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য হঠাৎ ডেকে বলল, “দেখো, দেখো ওটা আমার ভাইয়ের বাইক না? ওই…ওই তো, নাম্বার প্লেটের নিচে নামটা দেখো”

সুমিত দেখে চমকে উঠল। এতক্ষণ যা শুনেছিল তবে কি এই পরিণতির শিকার হল রণিত?

আরও একবার রণিতের ফোনে রিং করল সুমিত। এবারেও কোনও উত্তর না পাওয়ায় তাদের আশঙ্কা যেন আরও তাদেরকে চেপে ধরল।

এক মুহূর্ত দেরি না করে তারা পিছনে ছুটল বাইক নিয়ে। কিছুদূর যেতেই দেখল সেই জায়গাটা যেখানে বেশ ভিড় ছিল একটু আগেও। রিমলি আর নিজেকে ঠিক রাখতে না পেরে বাইক থেকে নামতে না নামতেই বসে পড়ল মাটিতে। অসুস্থ বোধ করায় ওকে ধরে রাস্তার পাশে একটা জায়গায় কোনও রকমে নিয়ে গেল সুমিত। দু-একজন কৌতূহলী লোক কাছে এগিয়ে আসতেই রিমলি অস্ফুট গলায় বলল,”র..রণিত…”

সুমিত ওদের কাছে জানতে চাইল যাদের দূর্ঘটনা ঘটেছে তাদের ওরা চেনে কিনা। ওদের উত্তর শুনে সুমিতের আর বুঝতে কিছু বাকি থাকল না। লোকাল হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে শুনে সুমিত ওখানেই যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিল। অসুস্থ শ্বশুরকে আর চিন্তিত না করে শাশুড়ির ফোনেই কল করল সে। বিশেষ কিছু না জানিয়ে শান্ত গলায় জানতে চাইল রণিত কোথায়?

শাশুড়ি জানালেন রণিত নাকি অনেকক্ষণ আগেই বাইক নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে, এখনও তো কই ফেরেনি, ফোনেও পাওয়া যাচ্ছেনা ওকে।

বুকের ভিতরটা ছ্যাঁত করে উঠল সুমিতের। রিমলিকে পাশের একটা জায়গায় বসিয়ে মুখে চোখে জল দেওয়ার চেষ্টা করছে কিছুজন। কী করা উচিত আর কী নয় সেটা ঠিক স্থির করে উঠতে পারছেনা সুমিত। হঠাৎ করে ফোনের রিং হতেই চমকে উঠল সে। কখনও কখনও এমন কিছু ঘটে যেটা বাস্তবিকই স্বপ্ন বলেই মনে হয়। সম্ভাবনাহীন অবস্থা থেকেও আশার আলো জ্বলে ওঠে, যা অকল্পনীয়। সুমিতের কাছে যা আজও একটা ‘মীরাক্কেল’ হয়েই থেকে গেল! তা হল রণিতের ফোন। ফোন ধরতেই রণিতের গলা শুনে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি সুমিত, কিছুক্ষণ পরে ধাতস্ত হয়ে রণিতের কথা শুনে ধরে প্রাণ এল তার, হিসাবে যেন সব গড়মিল হয়ে যাচ্ছে। তবুও প্রচন্ড উৎকন্ঠা নিয়ে রণিতের কথাগুলো সব শুনল সে। রণিত এখন শোকে মূহ্যমান। তার বন্ধুবিয়োগের যন্ত্রণা সুমিতকে ব্যাথিত করেছিল ঠিকই কিন্তু রণিতকে একপ্রকার নিশ্চিত না পাওয়ার দেশ থেকে হঠাৎ এই আলোকময় পৃথিবীতে দেখতে পাওয়ার আশায় আনন্দিত হয়েছিল অনেকখানি সেকথা বলাই বাহুল্য। জন্মদিনে তার বাইক নিয়ে দুই বন্ধু তার জন্য উপহার কিনতে এসেই নাকি এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার। জন্মদিনে এমন উপহারের জন্য রণিত একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। হঠাৎ দেখে খালের পাশে পড়ে থাকা একটা চকচকে হেডফোন তুলে এনে কমবয়সী একটা ছেলে কানে ধরে পাশের বন্ধুকে বলল, “দেখ, এখনও কেমন গান শোনা যাচ্ছে। মোবাইল ফোনটা নিশ্চয় কাছেই আছে, চল খুঁজে দেখি।”

দু’জন মানুষ তাদের জীবনের বিনিময়ে অনেক বড়ো শিক্ষা উপহার দিয়ে গেল বন্ধুর জন্মদিনে! রিমলি তার ব্যাগের ভিতরে থাকা নতুন ব্লু-টুথ হেডসেটটা বের করে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। ‘সেফ ড্রাইভ, সেভ লাইফ’ লেখা সাইনবোর্ডে ধাক্কা খেয়ে সেটা মিলিয়ে গেল অন্য কোথাও। 

Author

  • Barun@Mukherjee

    নবতরু ই-পত্রিকার সম্পাদক বরুণ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৮৪ সালে। বীরভূম জেলার নানুর থানার শ্রীকৃষ্ণপুরের গ্রামের বাড়িতেই বড়ো হয়ে ওঠেন। আবাসিক ছাত্র হিসাবে বিদ্যালয় জীবন অতিবাহিত করেন বিশ্বভারতীর পাঠভবন ও উত্তর শিক্ষা সদনে। বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ বরুণ মুখোপাধ্যায় বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত আছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি ভালোবাসেন লেখালেখি করতে। এছাড়াও সাংস্কৃতিক চর্চা ও সৃজনশীল কাজকর্মের মধ্যে নিজেকে সর্বদা যুক্ত রাখেন। নতুন ছেলেমেয়েদের মধ্যে সাহিত্য সৃষ্টির উন্মেষ ঘটানোর জন্যই দায়িত্ব নিয়েছেন নবতরু ই-পত্রিকা সম্পাদনার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আয়নাবন্দি: জিৎ সরকার (১/১২ পর্ব)
গদ্য- সাহিত্য গল্প ধারাবাহিক গল্প

আয়নাবন্দি: জিৎ সরকার

    গাড়িটা যখন বড়ো গেটের সামনে এসে দাঁড়াল তখন শেষ বিকেলের সূর্য পশ্চিমাকাশে রক্তাভা ছড়িয়ে সেদিনকার মতো সন্ধ্যেকে আলিঙ্গন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

    বিশদে পড়তে এখানে ক্লিক করুন
    শৈশবের গরমকাল: ঈশিতা পাল
    গদ্য- সাহিত্য স্মৃতিকথা

    শৈশবের গরমকাল: ঈশিতা পাল

      আমার শৈশব ভাড়াবাড়িতে। তাই গরমের ছুটিতে কাকু, জেঠুদের বাড়ি টানা একমাস ছুটি কাটাতে যেতাম। মামাবাড়িও যেতাম। ছেলেবেলার গরমকাল জুড়ে বেশ কিছু মজার স্মৃতি আছে

      বিশদে পড়তে এখানে ক্লিক করুন
      চাদিফাঁটা আমার সেকাল: বন্দে বন্দিশ
      গদ্য- সাহিত্য স্মৃতিকথা

      চাঁদিফাটা আমার সেকাল: বন্দে বন্দিশ

        মনে পড়ে যায় ছেলেবেলার সেইসব দিন, প্রচন্ড গরম থেকে স্বস্থির আরাম

        বিশদে পড়তে এখানে ক্লিক করুন