Recent Post

আরও একবার(২য় পর্ব)

আরও একবার(২য় পর্ব) – জিৎ সরকার

প্রথম পর্বটি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন

এ গল্পের শুরু বছর সাতেক আগে এমনই এক শরতে, দুর্গাপুজোর সময়। সায়ক তখন কলেজের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র।

চতুর্থীর দিন সকালে অম্লান এসে বলল   “ভাই চল, শুভ্রদা কিন্তু আজ তাড়াতাড়ি রিহার্সাল রুমে যেতে বলেছে। অনেকটা দেরি হয়ে গেল রে।”

সায়ক তখন সবে সকালের জলখাবার শেষ করছিল। সে বলল, “দেরি যখন হয়েই গেল আর একটু বসে যা। মা আজ লুচি আর সাদা আলুর তরকারি বানিয়েছে কটা টেস্ট করে যা।”  

অম্লান কে খাওয়ার ব্যাপারে কোনোদিনই একবারের বেশি দুবার বলতে হয় না। সে বলল “গ্রান্ড, কিন্তু জেঠিমাকে তাড়াতাড়ি করতে বল। বেশি দেরি করলে শুভ্রদা কেমন ক্ষেপে যায় জানিস তো।” 

সায়ক বলল, “ঠিক আছে দেরি হবে না”, বলেই তনিমার উদ্দ্যেশে হাঁক দেয়, “তনি, মা কে বলো অম্লান এসেছে ওকেও জলখাবার দিতে”।  

আসলে কলেজে সায়কদের একটা গ্রুপ আছে সায়ক, অম্লান, আভা, আর ওদের সিনিয়র শুভ্র ও আরও কয়েকজনকে নিয়ে গান বাজনা আর আবৃত্তির একটা জমাটি গ্রুপ। কলেজের ভেতরে আর বাইরে তারা টুকটাক বেশ ভালোই অনুষ্ঠান করে। আর ফি-বছর সায়কদের পাড়ার পুজোয় ওদের অনুষ্ঠান বাঁধা।

খাওয়াদাওয়া শেষ করে দুই বন্ধু যখন বেরোচ্ছিল তখন পাশের ঘর থেকে সায়কের বাবা বললেন, “এখন নাচগান করছ করো। তবে সামনেই এম এস সি ভর্তি, বইগুলো নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি কোরো, পুজোর আনন্দে পড়া শিকেয় তুলে দিয়ো না।” 

সায়ক ছোট্টো করে একটা “হু” বলে বেরিয়ে এলো। সায়ক কাজকর্মে ফাঁকি মারে এ কথা তার অতি বড়ো শত্রু বলতে পারবে না। তবুও তার বাবা এ কথাগুলো যে কেন বলেন? আসলে সায়কের বাবা সমরবাবুর ছাত্র জীবনটা খুবই উজ্জ্বল ছিল কিন্তু কর্মজীবনে এসে সেই উজ্জ্বলতা হ্রাস পেয়েছে অনেকখানি। তাঁর জীবনের অ্যামবিশান ছিলো অনেক বড়ো চাকুরি, বড়ো বাড়ি, বড়ো গাড়ি, বছরে দুবার অন্তত বিদেশ-বিভুঁই ভ্রমণ, ওই আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলেদের যেমন থাকে। কিন্তু বর্তমানে সেগুলো সরকারি আফিসে একটা চেয়ারে ঠায় বসে কলম পেষা ক্লার্ক সমরবাবুর কোমরের হাড়ের মতোই ক্ষয়িষ্ণু। সেগুলো রাত্রে মাঝে মাঝে গভীর ঘুমের মধ্যে দেখা দেয় বটে কিন্তু বাস্তবের খোলা চোখে ধরা দেয় না।  তাই স্বভাবতই তিনি তাঁর না-পাওয়া গুলো সায়কের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন।

তবে  সায়কের নিজস্ব একটা স্বপ্ন আছে বা বলা ভালো এটা সে তার মায়ের কাছ থেকে পেয়েছে। সে একটা রেস্তোরাঁ খুলতে চায় যেখানে এপার বাংলা ওপার বাংলার খাবারের সাথে থাকবে গান। বাংলা গান ও খাবারে উদযাপন। তার বাবা তাকে সমর্থন করেন না, তার বাবা এটা বোঝেন না যে সায়ক জীবনে বড়ো সরকারি চাকরির সেফটি চায় না, জীবনের ওঠাপড়াটা দেখতে চায়। এই নিয়ে বাবা ছেলের মধ্যে বিরোধ, যেটা ক্রমে চরমে পৌঁছেছে।

দুই বন্ধুতে যখন রির্হাসাল রুমের দরজার কাছে পৌঁছল তখন দুজনে শুনতে পেল বন্ধ দরজার ওদিক থেকে এসরাজের আওয়াজ ভেসে আসছে। বিভাস, সকালের রাগ। তারা দুজন বেশ অবাক হয়, তাদের দলে গিটার, ভায়োলিন বাজানোর লোক আছে বটে কিন্তু এসরাজ বাজানোর লোক আছে বলে তো জানা ছিল না। দরজা খুলে ঘরের ভেতরে ঢুকেই সায়ক একটু থমকায়।  ঘরের ঠিক মাঝখানেই একটি মেয়ে বসে,  বয়সটা সায়কদের মতো, লম্বা ছিপছিপে গড়ন, গায়ের রঙ ফর্সা নয় বরং একটু চাপা। ঘরের মাঝখানে বিছানো শতরঞ্চির উপর বসে একমনে মাথানিচু করে বাজিয়ে চলেছে। বাজানো শেষ হওয়ার পর মেয়েটি মাথা তোলে। তার আয়ত টানা দুটি চোখ, ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি সায়কের নজর কাড়ে।

পরিচয়ের দায়িত্বটা আভাই নেয়। মেয়েটির নাম অনুমিতা। আভার পাশের বাড়িতে ভাড়া এসেছে কিছুদিন হলো। তার বাবা আগে থাকত মফঃস্বল একটা শহরের কাজের সূত্রে। অনুমিতা অবশ্য কলকাতায় থাকত একটা গার্লস হোস্টেলে। সে অর্থনীতিতে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। এখন তার বাবা কালকাতায় বদলি হয়ে এসে সপরিবারে আভাদের পাশের বাড়িতে উঠেছে। সে ভালো এসরাজ বাজায় জেনে আভাই তাকে জোর করে ধরে এনেছে তাদের দলে।

সায়ক রুমের একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল আনমনা ভাবে। অনুমিতাই এগিয়ে এসে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “হ্যালো,আমি অনুমিতা, আপনার নামটা?”  

সায়ক কয়েকটা সেকেন্ড হ্যাংলার মতো চেয়ে রইল, তারপর খেয়াল হতেই সে বলল, “আমি সায়ক, পরিচয় হয়ে খুব ভালো লাগল।”

একটু আগের আচরণের জন্য সে রীতিমতো একটু বিব্রত।  আবার অনুমিতাই বলে, “আমি আপনাকে তুমি আর সায়কদা বলব, আপনিও আমাকে তুমি করে বলুন, কেমন?”

সায়ক বলল  “হ্যাঁ,অবশ্যই।”

শুরুটা এভাবেই হয়েছিল।

এরপরের কয়েকটা দিন অন্যমনস্কতা বেড়েই চলল সায়কের। তার দৃষ্টিক্ষমতা তার ইচ্ছের বিরুদ্ধেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সপ্তমীর সন্ধ্যাই হোক অথবা অষ্টমীর অঞ্জলি, তার দৃষ্টির মনোযোগ এখন অনুমিতা। হয়ত এত বছরে প্রথমবার সায়কের মন্ত্রোৎচ্চারনে ছেদ পড়ল। তার হাতের ছুঁড়ে দেওয়া ফুল মা দুর্গা পা পর্যন্ত পৌঁছল কিনা, সেদিকে সায়কের খেয়াল ছিল না। নবমীর রাতের অনুষ্ঠানে যখন অনুমিতা সায়কের পাশে বসে বাজাচ্ছিল তখন সায়কের মনে হচ্ছিল সে গান বন্ধ করে অনুমিতার বাজনা শোনে, তার গানের তাল কাটছিল বারবার। কিংবা দশমীর দিন সকালে যখন অনুমিতা তার গালে একটুখানি সিঁদুর ছুয়েছিল তখন নিজের মধ্যে অদ্ভূত শিহরন টের পেলো, আজানা এক আবেশ যেন তার সবকিছু অবশ করে দিচ্ছে।

এ-কদিনের অন্যমনস্কতা বন্ধুদের নজরে পড়েছে, তারা প্রশ্ন করেছে। প্রশ্ন সায়ক নিজেকেও করেছে। এমনটা কেন হয়? ওই একটি মানুষের কাছাকাছি থাকলেই এমন হয়, কেন? যে চৌকস, বাকপটু, ক্যারিয়ারিস্টিক সায়ক প্রেম জিনিসটাকে উইন্ডস্ক্রিনে বৃষ্টিফোটা বা সোডাওয়াটারের ওপরে বুদবুদের মতো মনে করত সেই কি শেষে…। আচ্ছা, দোষটা ঠিক কার,  তার নিজের, অনুমিতার, নাকি শরতের আবহাওয়ার?

ক্রমশ ….

Author

  • Barun@Mukherjee

    নবতরু ই-পত্রিকার সম্পাদক বরুণ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৮৪ সালে। বীরভূম জেলার নানুর থানার শ্রীকৃষ্ণপুরের গ্রামের বাড়িতেই বড়ো হয়ে ওঠেন। আবাসিক ছাত্র হিসাবে বিদ্যালয় জীবন অতিবাহিত করেন বিশ্বভারতীর পাঠভবন ও উত্তর শিক্ষা সদনে। বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ বরুণ মুখোপাধ্যায় বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত আছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি ভালোবাসেন লেখালেখি করতে। এছাড়াও সাংস্কৃতিক চর্চা ও সৃজনশীল কাজকর্মের মধ্যে নিজেকে সর্বদা যুক্ত রাখেন। নতুন ছেলেমেয়েদের মধ্যে সাহিত্য সৃষ্টির উন্মেষ ঘটানোর জন্যই দায়িত্ব নিয়েছেন নবতরু ই-পত্রিকা সম্পাদনার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আয়নাবন্দি: জিৎ সরকার (১/১২ পর্ব)
গদ্য- সাহিত্য গল্প ধারাবাহিক গল্প

আয়নাবন্দি: জিৎ সরকার

    গাড়িটা যখন বড়ো গেটের সামনে এসে দাঁড়াল তখন শেষ বিকেলের সূর্য পশ্চিমাকাশে রক্তাভা ছড়িয়ে সেদিনকার মতো সন্ধ্যেকে আলিঙ্গন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

    বিশদে পড়তে এখানে ক্লিক করুন
    শৈশবের গরমকাল: ঈশিতা পাল
    গদ্য- সাহিত্য স্মৃতিকথা

    শৈশবের গরমকাল: ঈশিতা পাল

      আমার শৈশব ভাড়াবাড়িতে। তাই গরমের ছুটিতে কাকু, জেঠুদের বাড়ি টানা একমাস ছুটি কাটাতে যেতাম। মামাবাড়িও যেতাম। ছেলেবেলার গরমকাল জুড়ে বেশ কিছু মজার স্মৃতি আছে

      বিশদে পড়তে এখানে ক্লিক করুন
      চাদিফাঁটা আমার সেকাল: বন্দে বন্দিশ
      গদ্য- সাহিত্য স্মৃতিকথা

      চাঁদিফাটা আমার সেকাল: বন্দে বন্দিশ

        মনে পড়ে যায় ছেলেবেলার সেইসব দিন, প্রচন্ড গরম থেকে স্বস্থির আরাম

        বিশদে পড়তে এখানে ক্লিক করুন